মুরগির কোর্মা রেসিপি
ভূমিকা
মুরগির কোর্মা একটি ঐতিহ্যবাহী মুঘলীয় খাবার, যা দই, বাদাম ও সুগন্ধি মসলার মিশ্রণে তৈরি হয়। বিশেষ অনুষ্ঠান, বিয়ের দাওয়াত কিংবা অতিথি আপ্যায়নে এই রেসিপির জুড়ি নেই।
আজকের ব্লগে আমরা জানব কিভাবে ঘরেই সহজে বানানো যায় রেস্টুরেন্ট স্টাইলের মুরগির কোর্মা।
উপকরণ (৪–৫ জনের জন্য)
মেরিনেডের জন্য
- মুরগির মাংস – ১ কেজি (টুকরা করা)
- দই – ১ কাপ
- আদা-রসুন বাটা – ২ টেবিল চামচ
- লবণ – স্বাদমতো
- লাল মরিচ গুঁড়া – ১ চা চামচ
- হলুদ গুঁড়া – ½ চা চামচ
- ধনে গুঁড়া – ১ চা চামচ
- জিরা গুঁড়া – ১ চা চামচ
ঝোলের জন্য
- পেঁয়াজ – ৩ কাপ (পাতলা কুচি)
- ঘি/তেল – ½ কাপ
- দারুচিনি – ২ টুকরা
- এলাচ – ৪–৫টি
- লবঙ্গ – ৪–৫টি
- তেজপাতা – ২টি
- কাজুবাদাম – ৮–১০টি (ভিজিয়ে পেস্ট করা)
- নারকেল দুধ বা ফ্রেশ ক্রিম – ½ কাপ
- গরম মসলা গুঁড়া – ১ চা চামচ
- কাঁচা মরিচ – ৩–৪টি
- কেওড়া জল বা গোলাপ জল – ১ চা চামচ

প্রস্তুত প্রণালী
ধাপ ১: মুরগি মেরিনেট করা
১. মুরগি ধুয়ে পরিষ্কার করুন।
২. দই, আদা-রসুন বাটা, লাল মরিচ, হলুদ, ধনে, জিরা গুঁড়া ও লবণ দিয়ে মাখিয়ে অন্তত ১ ঘণ্টা রেখে দিন।
ধাপ ২: পেঁয়াজ ভাজা
১. কড়াইতে ঘি বা তেল গরম করুন।
২. পেঁয়াজ দিয়ে সোনালি বাদামি করে ভেজে বারস্তা তৈরি করুন।
৩. কিছুটা সাজানোর জন্য আলাদা রাখুন।
ধাপ ৩: ঝোল তৈরি
১. কড়াইতে দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও তেজপাতা দিয়ে ভাজুন।
২. মেরিনেট করা মুরগি ঢেলে মাঝারি আঁচে নেড়ে ভাজুন।
৩. কাজুবাদামের পেস্ট মিশিয়ে দিন।
৪. অল্প গরম পানি দিয়ে ঢেকে মুরগি নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।
ধাপ ৪: ফাইনাল টাচ
১. নারকেল দুধ বা ক্রিম দিন এবং আরও ৫ মিনিট রান্না করুন।
২. গরম মসলা, কাঁচা মরিচ ও কেওড়া জল ছিটিয়ে নিন।
৩. উপর থেকে ভাজা পেঁয়াজ ছড়িয়ে চুলা বন্ধ করুন।
পরিবেশন
গরম গরম মুরগির কোর্মা পরিবেশন করুন নান রুটি, পরোটা, পোলাও বা ঝরঝরে ভাতের সাথে।
✅ পারফেক্ট কোর্মার টিপস
- দই ব্যবহার করলে কোর্মা ঝোল ঘন হয়।
- কাজুবাদাম না থাকলে বাদাম ব্যবহার করা যায়।
- বেশি পানি দিলে ঝোল পাতলা হয়ে যাবে, তাই অল্প অল্প করে পানি দিন।
- কেওড়া জল বেশি দেবেন না, নাহলে স্বাদ কটু লাগতে পারে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. মুরগির কোর্মা কি তেল ছাড়া রান্না যায়?
👉 হ্যাঁ, তবে ঘি দিলে আসল স্বাদ পাওয়া যায়।
২. কোর্মায় কি দুধ ব্যবহার করা যাবে?
👉 হ্যাঁ, তবে নারকেল দুধ বা ফ্রেশ ক্রিম ব্যবহার করলে স্বাদ আরও ভালো হয়।
৩. মুরগির কোন অংশ কোর্মার জন্য ভালো?
👉 লেগ পিস ও ব্রেস্ট মিলিয়ে নিলে কোর্মা সুস্বাদু হয়।
মুরগির কোর্মা এমন একটি ডিশ, যা অতিথি আপ্যায়ন বা উৎসবে পরিবেশন করলে সবার মন জয় করে নেয়।
👉 ঝরঝরে ভাত, নান বা পোলাওয়ের সাথে পরিবেশন করলে স্বাদের পরিপূর্ণতা আসে।
বাংলাদেশি রান্নায় “মুরগির কোর্মা” এমন একটি পদ, যা একদিকে ঐতিহ্যের প্রতীক, অন্যদিকে অতিথি আপ্যায়নের অপরিহার্য অংশ। কোর্মা শব্দটি এসেছে পারস্য ভাষা থেকে, যার অর্থ ধীরে ধীরে রান্না করা মাংস।
এটি এমন এক খাবার যার মিষ্টি-মসলাযুক্ত গন্ধ, ঘন গ্রেভি আর নরম মাংস যে কাউকে মুগ্ধ করে।
আজকের ব্লগে জানবো —
👉 মুরগির কোর্মার সাথে কী খাওয়া যায়
👉 কোন কোন অনুষ্ঠানে এটি বেশি জনপ্রিয়
👉 এবং কেন এটি এখনো সবার প্রিয় একটি খাবার
🍛 মুরগির কোর্মার সাথে কী খাওয়া যায়
মুরগির কোর্মার স্বাদ এত সমৃদ্ধ ও ঘন যে, এটি বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে যায়। নিচে সবচেয়ে জনপ্রিয় কম্বিনেশনগুলো দেওয়া হলো 👇
১. পোলাও
বাংলাদেশে মুরগির কোর্মার সবচেয়ে ক্লাসিক সঙ্গী হলো সুগন্ধি পোলাও।
বাসমতি চাল, ঘি, এবং দারুচিনি-এলাচের ঘ্রাণে ভরা পোলাও মুরগির কোর্মার মিষ্টি-মসলাদার গ্রেভির সঙ্গে এক অসাধারণ মিল গড়ে তোলে।
➡️ কেন মানায়: পোলাওয়ের হালকা স্বাদ কোর্মার ঘন মশলা ও দইয়ের ভারসাম্য রাখে।
২. পরোটা বা রুটি
অনেকে সকালের বা রাতের খাবারে পরোটা বা নরম রুটি দিয়ে মুরগির কোর্মা খেতে পছন্দ করেন।
বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট বা বাসার ছোট জমায়েতে এই কম্বিনেশন জনপ্রিয়।
➡️ কেন মানায়: পরোটা বা রুটি কোর্মার গ্রেভি ভালোভাবে শোষণ করে, ফলে প্রতিটি কামড়েই থাকে মশলার স্বাদ।
৩. খিচুড়ি
বৃষ্টির দিনে বা হালকা খাবার হিসেবে মুরগির কোর্মা ও মসলা খিচুড়ি জুটি বেশ জনপ্রিয়।
এই মিশ্রণটি হজমে সহজ এবং খুবই রুচিকর।
➡️ কেন মানায়: কোর্মার ঝোল খিচুড়ির নরম ভাত-ডালের সঙ্গে মিশে অসাধারণ স্বাদ দেয়।
৪. সালাদ ও বোরহানি
অতিথি আপ্যায়ন বা বিয়ের অনুষ্ঠানে মুরগির কোর্মার সঙ্গে সালাদ, বোরহানি এবং পেঁয়াজ ভর্তা পরিবেশন করা হয়।
➡️ কেন মানায়: বোরহানির ঠান্ডা টকভাব ও সালাদের সতেজতা কোর্মার ঘন স্বাদের ভার কমিয়ে দেয়, ফলে খাবার হয় আরও উপভোগ্য।
৫. ডেজার্ট
মুরগির কোর্মা খাওয়ার পর সাধারণত মিষ্টি দই, পায়েস বা জর্দা পরিবেশন করা হয়।
এটি খাবারের শেষটিকে করে তোলে মিষ্টি ও স্মরণীয়।
কোন কোন অনুষ্ঠানে মুরগির কোর্মা বেশি হয়
মুরগির কোর্মা শুধু সাধারণ খাবার নয়, এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও উৎসবের অংশ। নিচে দেখা যাক, কোন কোন উপলক্ষে এটি সবচেয়ে বেশি রান্না হয় 👇
১. বিয়ে ও গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান
বিয়েবাড়ির মেনুতে “মুরগির কোর্মা ও পোলাও” প্রায় অপরিহার্য।
এই খাবারটি অতিথি আপ্যায়নের ঐতিহ্য বহন করে এবং অনেকের জন্য স্মৃতিময় স্বাদ তৈরি করে।
➡️ কারণ: কোর্মার মিষ্টি-মসলাদার স্বাদ সব বয়সের অতিথির কাছে গ্রহণযোগ্য।
২. ঈদ ও ধর্মীয় উৎসব
ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা— উভয় উৎসবেই মুরগির কোর্মা একটি সাধারণ কিন্তু বিশেষ পদ।
অনেকে সকালে সেমাই বা সেমাই-রুটি খাওয়ার পর দুপুরে কোর্মা-পোলাও উপভোগ করেন।
➡️ কারণ: এটি একদিকে পুষ্টিকর, অন্যদিকে উৎসবের রুচি অনুযায়ী ভারী ও ঘ্রাণযুক্ত খাবার।
৩. জন্মদিন ও পারিবারিক অনুষ্ঠান
জন্মদিন, দোয়া মাহফিল, কিংবা বন্ধুবান্ধবের ছোট গেট টুগেদারে মুরগির কোর্মা ও পরোটা এখন অনেক জনপ্রিয় বিকল্প।
➡️ কারণ: কোর্মা রান্না করা সহজ, সুস্বাদু, এবং অতিথিদের পছন্দনীয়।
৪. ঘরোয়া জমায়েত
ছুটির দিনে বা শুক্রবারে পরিবারের সবাই মিলে খাওয়ার সময় অনেকেই কোর্মা রান্না করেন।
এই খাবারটি এমনকি ফ্রিজে রেখে পরদিনও খাওয়া যায়, স্বাদ অটুট থাকে।
➡️ কারণ: এটি রান্নায় তুলনামূলক সহজ এবং ঘরে থাকা উপকরণ দিয়েই তৈরি করা যায়।
মুরগির কোর্মা জনপ্রিয় হওয়ার কারণ
১️⃣ ঐতিহ্য ও ইতিহাস
কোর্মা মূলত মোগল আমলের খাবার, যা পরে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে জনপ্রিয় হয়।
রাজকীয় ভোজে এটি ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, কারণ এতে দই, বাদাম, কিসমিস, ঘি ও মশলার সমৃদ্ধ ব্যবহার রয়েছে।
২️⃣ স্বাদের বৈচিত্র্য
মুরগির কোর্মার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বাদে ভারসাম্য—
না খুব ঝাল, না খুব মিষ্টি।
দই, পেঁয়াজ বাটা, ঘি ও দারুচিনির মিশ্রণ এমন এক ঘ্রাণ তৈরি করে যা যে কাউকে আকর্ষণ করে।
৩️⃣ সহজলভ্য উপকরণ
কোর্মা রান্নায় যে উপকরণ লাগে —
মুরগি, দই, পেঁয়াজ, আদা-রসুন, ঘি, গরম মশলা — এগুলো প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই পাওয়া যায়।
তাই এটি অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এবং সহজে প্রস্তুতযোগ্য।
৪️⃣ সব বয়সের উপযোগী
কোর্মা ঝাল নয় বলে এটি শিশু থেকে বয়স্ক— সবার জন্য উপযুক্ত।
তাই এটি পারিবারিক খাবারে জনপ্রিয়।
৫️⃣ পরিবেশনে আভিজাত্য
কোর্মার রঙ, ঘ্রাণ ও উপস্থাপনা সবই “রিচ” মনে হয়।
বিয়েবাড়ি বা উৎসবে এটি পরিবেশন করলে খাবার টেবিলের সৌন্দর্য বেড়ে যায়।
🧂 মুরগির কোর্মা রান্নার সংক্ষিপ্ত টিপস
1️⃣ দই ও পেঁয়াজ বাদামি করে ভেজে নিলে কোর্মা হয় ঘন ও সুগন্ধি।
2️⃣ কম আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করুন— এতে মাংস হয় নরম ও রসালো।
3️⃣ কোর্মায় ঘি ও কিসমিস ব্যবহার করলে রাজকীয় স্বাদ পাওয়া যায়।
4️⃣ রান্নার শেষে এক চিমটি জায়ফল গুঁড়া দিলে ঘ্রাণ দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
মুরগির কোর্মা শুধু একটি খাবার নয়, এটি বাংলাদেশের রন্ধন ঐতিহ্যের এক মিষ্টি প্রতীক।
বিয়েবাড়ি, ঈদ, কিংবা ছুটির দিনে পরিবারের সবাই মিলে কোর্মা খাওয়া মানেই এক অন্যরকম আনন্দ।
এটি এমন এক খাবার যা একদিকে রুচিশীল ও পুষ্টিকর, অন্যদিকে সংস্কৃতির অংশ।
সঠিক উপকরণ ও ভালোবাসা দিয়ে রান্না করলে মুরগির কোর্মা হতে পারে আপনার প্রতিদিনের খাবারেও এক উৎসবের স্বাদ।

