পিএমএস বনাম পিএমডিডি: পার্থক্য, তীব্রতা ও সঠিক চিকিৎসা (PMS vs PMDD)
মাসিক পূর্ববর্তী লক্ষণ—সাধারণ অস্বস্তি নাকি গুরুতর মানসিক সমস্যা?
মাসিক শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে মহিলাদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক কিছু পরিবর্তন আসা খুবই স্বাভাবিক। এই লক্ষণগুলোর সমষ্টিকে প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম বা পিএমএস (PMS) বলা হয়। বেশিরভাগ নারীই তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময় এই সমস্যা অনুভব করেন। তবে কিছু নারীর ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো অস্বাভাবিকভাবে তীব্র হয় এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন, কাজ ও সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। এই গুরুতর অবস্থাকে বলা হয় প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার বা পিএমডিডি (PMDD)।
পিএমএস এবং পিএমডিডি-এর মধ্যে মূল পার্থক্য হলো লক্ষণের তীব্রতা ও প্রকৃতি। অনেকেই এই দুটি অবস্থার পার্থক্য বুঝতে পারেন না। এই পোস্টে আমরা বিস্তারিত জানব পিএমএস বনাম পিএমডিডি এর মূল পার্থক্য কী, কীভাবে এই দুটি সমস্যা শনাক্ত করা যায় এবং এই উভয়ের জন্য আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও ঘরোয়া প্রতিকারগুলো কী কী।
১. প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম (PMS): সাধারণ ও প্রচলিত সমস্যা?
পিএমএস হলো প্রজনন সক্ষম মহিলাদের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ একটি অবস্থা। সাধারণত পিরিয়ড শুরু হওয়ার ৫ থেকে ১১ দিন আগে এর লক্ষণগুলো শুরু হয় এবং মাসিক শুরু হওয়ার সাথে সাথে কমে যায় বা পুরোপুরি চলে যায়।
পিএমএস-এর প্রধান লক্ষণসমূহ:
- শারীরিক লক্ষণ: স্তনে হালকা ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা, পেটে ফোলা ভাব (Bloating), ক্লান্তি, হালকা মাথাব্যথা, গাঁটে হালকা ব্যথা, খাবারে আগ্রহ বৃদ্ধি (Cravings)।
- মানসিক লক্ষণ: সামান্য মেজাজ পরিবর্তন (Mood Swings), অল্প বিরক্তি বা খিটখিটে মেজাজ, সামান্য উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা।
বিশেষত্ব: পিএমএস-এর লক্ষণগুলো সাধারণত সহনীয় হয় এবং দৈনন্দিন কার্যকলাপ বা স্বাভাবিক সম্পর্কগুলোর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। জীবনযাত্রার পরিবর্তন (ডায়েট ও ব্যায়াম) এবং স্ট্রেস কমানোর মাধ্যমে এই লক্ষণগুলো সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অনুমান করা হয়, প্রায় ৭৫% মহিলা জীবনে অন্তত একবার পিএমএস অনুভব করেন।
২. প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার (PMDD): গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
পিএমডিডি হলো পিএমএস-এর একটি গুরুতর এবং তীব্র রূপ, যা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর সরাসরি আঘাত হানে। পিএমডিডি আক্রান্ত মহিলার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম (প্রায় ২% থেকে ৫%) হলেও এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
পিএমডিডি-এর মূল পার্থক্যকারী লক্ষণসমূহ:
পিএমডিডি-কে মানসিক স্বাস্থ্য ডিসঅর্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এর লক্ষণগুলো মূলত মানসিক। প্রতি মাসিক চক্রে কমপক্ষে ৫টি লক্ষণ উপস্থিত থাকতে হবে, যার মধ্যে অন্তত একটি অবশ্যই মেজাজ সংক্রান্ত হতে হবে।
- তীব্র মানসিক লক্ষণ:
- গভীর বিষণ্নতা: প্রবল হতাশা, নিজেকে মূল্যহীন মনে করা, বা আত্মহত্যার চিন্তা আসা।
- উদ্বেগ ও উত্তেজনা: চরম অস্থিরতা, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় এবং তীব্র মানসিক চাপ।
- তীব্র মেজাজ পরিবর্তন: কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রচণ্ড রাগ থেকে গভীর কান্নায় চলে যাওয়া।
- ক্রমাগত রাগ: খুব সামান্য কারণেও তীব্র এবং অনিয়ন্ত্রিত রাগ বা খিটখিটে ভাব।
- সম্পর্কের অবনতি: পারিবারিক সদস্য, বন্ধু বা সহকর্মীদের সাথে তীব্র সংঘাত বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হওয়া।
- দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব: লক্ষণগুলো এতই তীব্র হয় যে এটি কাজ, পড়াশোনা, সামাজিক জীবন এবং সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
গুরুত্বপূর্ণ: পিএমডিডি-এর মানসিক কষ্ট অনেক সময় ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো মনে হতে পারে। তবে পার্থক্য হলো, পিএমডিডি-এর লক্ষণগুলো মাসিক শুরু হওয়ার পর দ্রুতই দূর হয়ে যায়।
৩. পিএমএস বনাম পিএমডিডি: মূল পার্থক্য সংক্ষেপে
| বৈশিষ্ট্য | পিএমএস (PMS) | পিএমডিডি (PMDD) |
| সাধারণতা | অত্যন্ত সাধারণ (৭৫% পর্যন্ত) | তুলনামূলক বিরল (২%–৫%) |
| তীব্রতা | মাঝারি; দৈনন্দিন কাজ বাধাগ্রস্ত হয় না। | চরম; জীবন, কাজ ও সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। |
| প্রধান লক্ষণ | শারীরিক (পেট ফোলা, ব্যথা, ক্লান্তি) | মানসিক ও আবেগিক (তীব্র বিষণ্নতা, রাগ, উদ্বেগ) |
| চিকিৎসার প্রয়োজন | সাধারণত জীবনযাত্রার পরিবর্তনই যথেষ্ট। | প্রায়শই ঔষধ (SSRIs) এবং থেরাপির প্রয়োজন হয়। |
৪. চিকিৎসা পদ্ধতি: কার জন্য কী প্রয়োজন?
পিএমএস এবং পিএমডিডি-এর চিকিৎসার লক্ষ্য হলো লক্ষণগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা।
ক. পিএমএস-এর চিকিৎসা (জীবনধারা পরিবর্তন):
- খাদ্যাভ্যাস: লবণ, চিনি, ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল গ্রহণ কমানো। ফল, শাকসবজি এবং জটিল কার্বোহাইড্রেট (যেমন: ওটস, ব্রাউন রাইস) বেশি খাওয়া।
- ব্যায়াম: নিয়মিত কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়াম (হাঁটা, সাঁতার) স্ট্রেস কমাতে এবং মেজাজ উন্নত করতে সাহায্য করে।
- পরিপূরক (Supplements): ভিটামিন বি৬, ম্যাগনেসিয়াম এবং ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট পিএমএস-এর শারীরিক লক্ষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে (চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে)।
- ব্যথা কমানো: হালকা শারীরিক ব্যথার জন্য ওভার-দ্য-কাউন্টার পেইনকিলার (যেমন: আইবুপ্রোফেন) নেওয়া যেতে পারে।
খ. পিএমডিডি-এর চিকিৎসা (চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে):
পিএমডিডি-এর ক্ষেত্রে মানসিক লক্ষণগুলো গুরুতর হওয়ায় জীবনযাত্রার পরিবর্তন প্রায়শই যথেষ্ট হয় না। এখানে বিশেষজ্ঞের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
- মনোযোগ ও থেরাপি: কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT) পিএমডিডি-এর মানসিক লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে অত্যন্ত কার্যকর। এটি রোগীকে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা পরিচালনা করতে শেখায়।
- নির্বাচনী সেরোটোনিন রিউপটেক ইনহিবিটরস (SSRIs): এটি পিএমডিডি-এর জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ওষুধ। এটি মস্তিষ্কের সেরোটোনিন মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে দ্রুত বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও রাগ কমাতে সাহায্য করে। এটি পিরিয়ডের মাত্র ১৪ দিন আগে বা পুরো মাস ধরে সেবন করা যেতে পারে, যা চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত।
- হরমোনাল চিকিৎসা: কিছু ক্ষেত্রে, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল বা হরমোন থেরাপি ডিম্বস্ফোটন প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়ে PMDD-এর লক্ষণগুলো কমাতে পারে।
৫. রোগ নির্ণয়: কীভাবে বুঝবেন আপনার কোনটি হয়েছে?
পিএমএস বা পিএমডিডি নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রক্ত পরীক্ষা নেই। চিকিৎসক প্রধানত আপনার লক্ষণের তীব্রতা এবং সময়কাল পর্যবেক্ষণ করেন।
- লক্ষণের ডায়েরি: চিকিৎসক আপনাকে অন্তত দুই থেকে তিন মাস ধরে আপনার মানসিক ও শারীরিক লক্ষণগুলো প্রতিদিন রেকর্ড করার পরামর্শ দেবেন।
- সময়কাল: যদি লক্ষণগুলো নিয়মিতভাবে পিরিয়ডের এক বা দুই সপ্তাহ আগে শুরু হয় এবং মাসিক শুরু হওয়ার সাথে সাথেই দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়, তবেই পিএমএস বা পিএমডিডি নিশ্চিত করা যায়।
পিএমএস একটি সাধারণ অস্বস্তি হলেও পিএমডিডি হলো একটি গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যার জন্য দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। নিজের লক্ষণের তীব্রতা ও প্রকৃতি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। যদি মনে হয় আপনার আবেগিক কষ্ট আপনার জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে, তবে দেরি না করে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা মনোবিদের পরামর্শ নিন। সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন আপনাকে সুস্থ ও সুখী জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে ইনশাআল্লাহ।

